নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

সদ্য শেষ হলো এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার উৎসব। যারা ভালো ফলাফল করেছে, তাদের চোখেমুখে এখন স্বপ্ন আর আনন্দ। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধুদের শুভেচ্ছায় ভাসছে তারা। সামনেই কলেজে ভর্তির পালা। কিন্তু ভর্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মাঝখানে বেশ কয়েক মাসের একটা লম্বা ছুটি বা অবসর। মেধাবী এই শিক্ষার্থীরা কি পারে না তাদের এই অফুরন্ত অবসর সময়টুকু সমাজের একটি অবহেলিত অংশ—প্রবীণদের জন্য ব্যয় করতে?

বইয়ের পাতায় পড়া নীতিবিদ্যা আর মানবিকতাকে এবার বাস্তবে রূপ দেওয়ার দারুণ এক সুযোগ এই ছুটি। জিপিএ ফাইভ পাওয়া বা ভালো রেজাল্ট করা তখনই সার্থক হবে, যখন এই মেধাবীরা ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়ে উঠবে। আর এর শুরুটা হতে পারে নিজের ঘর, আশেপাশের পাড়া-মহল্লা বা সমাজের প্রবীণ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

সদ্য এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা কীভাবে প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, চলুন জেনে নিই তার কিছু বাস্তবসম্মত উপায়:





একটু সময় আর গল্পগাছা একাকীত্বের সেরা ওষুধ
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো একাকীত্ব। ছেলেমেয়েরা কর্মব্যস্ত, নাতি-নাতনিরা পড়াশোনায় মগ্ন। সারা দিন তাদের হয়তো কারও সঙ্গে দুটো কথা বলার সুযোগ হয় না। এই শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় তাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক মানুষটার সঙ্গে কাটাতে পারে। তাদের পুরনো দিনের গল্প শোনা, তাদের অভিজ্ঞতার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা—এটুকুতেই একজন প্রবীণ মানুষ যে পরিমাণ আনন্দ পান, তা হয়তো কোনো দামি উপহারেও মেলে না।




প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রবীণদের ‘গাইড’

আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দারুণ দক্ষ। অন্যদিকে, স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের এই যুগে প্রবীণরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের অসহায় বোধ করেন। শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। বয়স্ক মানুষটিকে স্মার্টফোনে কীভাবে ইউটিউবে পছন্দের ওয়াজ, গান বা পুরোনো দিনের নাটক দেখতে হয়, তা শিখিয়ে দেওয়া যায়। বিদেশে বা দূরে থাকা সন্তানদের সঙ্গে কীভাবে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করতে হয়, তা শিখিয়ে দিলে তাদের একাকীত্ব অনেকটাই ঘুচে যাবে।

ছোট্ট কাজে বড় স্বস্তি
বয়স্ক মানুষদের অনেক সময় ছোটখাটো কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই দায়িত্বগুলো নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারে। যেমন—নিয়ম করে প্রবীণ মানুষটির ওষুধের বক্স গুছিয়ে দেওয়া, প্রেসার বা ডায়াবেটিস মাপতে সাহায্য করা, কিংবা তাকে সঙ্গে নিয়ে বিকেলে বা সকালে একটু হাঁটাহাঁটি করা। এমনকি, পত্রিকা পড়ার সময় চশমাটা এগিয়ে দেওয়া বা খবরের কাগজটা একটু পড়ে শোনানোর মতো ছোট কাজগুলোও প্রবীণদের মনে প্রশান্তি আনে।

চিকিৎসা সেবায় সহায়তা
অনেক সময় বয়স্ক মানুষদের ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়া বা হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রযুক্তির জটিলতায় তারা অনলাইনে সিরিয়াল নিতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার করে টেলিমেডিসিন সেবা নেওয়া, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা বা দরকারি ওষুধগুলো ফার্মেসি থেকে কিনে এনে দেওয়ার মতো কাজগুলো করতে পারে।

স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন
একা একা কাজ করার চেয়ে দল বেঁধে কাজ করলে তার প্রভাব হয় অনেক বড়। এসএসসি পাস করা বন্ধুরা মিলে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক একটি ছোট ‘ভলান্টিয়ারিং গ্রুপ’ বা স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করতে পারে। এই দলের কাজ হবে এলাকার বয়স্ক মানুষদের খোঁজখবর নেওয়া। কোনো প্রবীণ মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সাহায্য করা, কিংবা মাসে অন্তত একদিন এলাকার প্রবীণদের নিয়ে ছোটখাটো একটা আড্ডার আয়োজন করা।

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন

প্রবীণ বয়সে অনেকেই বিষণ্ণতায় ভোগেন। নিজেকে পরিবারের ‘বোঝা’ মনে করার একটা মানসিক যন্ত্রণা তাদের কুরে কুরে খায়। মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের সুন্দর ও পজিটিভ কথাবার্তা দিয়ে প্রবীণদের এই ভুল ধারণা ভাঙতে পারে। তাদের বোঝাতে পারে যে, তারা বোঝা নয়, বরং বটগাছের মতো ছায়া। তরুণদের এই সম্মান ও ভালোবাসা প্রবীণদের বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা জোগাবে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার কারণে প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে, তরুণরা সারাদিন ডুবে থাকছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই দুই প্রজন্মের মধ্যে যদি একটি বন্ধুত্বের সেতু তৈরি করা যায়, তবে সমাজটাই পালটে যাবে। এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা যেহেতু জীবনের একটি নতুন ধাপে পা রাখছে, তাই এখনই তাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার সেরা সময়।

শুধু ভালো ছাত্র হলেই চলবে না, হতে হবে ভালো মানুষও। এসএসসির এই চমৎকার সাফল্যের পর তরুণ মেধাবীদের মমতার হাত যখন কোনো প্রবীণের কাঁধে পড়বে, তখন সেই প্রবীণের মন থেকে যে দোয়া আসবে—তা তাদের আগামী দিনের পথচলাকে করবে আরও মসৃণ ও আলোকিত। বইয়ের পাতার বাইরে জীবনের এই পাঠশালায় প্রবীণদের সেবা করেই তারা শিখুক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি।



Previous Post Next Post